রবিবার ১ নভেম্বর ২০২৬ - ১৫:২৯
যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্ক তীব্রতর

যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচারণা শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আলাস্কা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনী বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আলাস্কায় গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচন নিয়ে ফৌজদারি তদন্তের উদ্যোগ এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকযোগে দেওয়া হাজার হাজার ভোট বাতিলের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি প্রচেষ্টা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লক্ষ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আলাস্কার গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকযোগে দেওয়া হাজার হাজার ভোট নিয়ে চলমান বিরোধ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াই

আলাস্কায় ফেডারেল প্রসিকিউটররা তদন্ত করছেন, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার সহযোগীরা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছিলেন কি না। কারণ, তাঁর নাম বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান এস. সুলিভানের নামের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে আগামী মঙ্গলবারের ভোটে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।

বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ৫৩ এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭। প্রতিনিধি পরিষদেও রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

এদিকে আগাম ভোটদানের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মার্কিন নাগরিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অথবা ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটের দিনের আগে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।

আলাস্কায় ফৌজদারি তদন্ত জোরদার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে, আলাস্কার সিনেট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ফৌজদারি তদন্তের গতি বাড়ানো হবে।

আলাস্কায় এফবিআইয়ের জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী কর্মকর্তা মাইকেল হেইম্যান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন তদন্তে এফবিআইয়ের সম্পদ ও জনবল বাড়াতে সহায়তা করেছে। তিনি এই মামলার জন্য কয়েকজন তদন্তকারীকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত চলছে।

এর আগে ট্রাম্প বিচার বিভাগকে আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, সমর্থিত রিপাবলিকান সিনেটর পরাজিত হলে নির্বাচনের ফলাফল অনুমোদন ঠেকানোর ব্যবস্থা করা।

এই মামলার পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দুই প্রার্থীর নাম প্রায় একই হওয়ায় ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছে, বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান নির্বাচনে জয়ী না হলে যেন ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা না হয়।

এদিকে বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এবং সাবেক কংগ্রেস সদস্য মেরি পেলটোলার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আলাস্কার এই সিনেট নির্বাচনকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি

মিশিগান অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

গত আগস্টে প্রগতিশীল প্রার্থী আবদুস সাঈদ কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করার পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সিনেটের প্রাথমিক নির্বাচনের বিরোধ মিটে যাবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনের আগে শেষ সপ্তাহে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে বিরোধ আবারও সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে।

স্টিভেন্স সম্প্রতি সিএনএন টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে পুনরায় জানিয়েছেন যে তিনি আবদুস সাঈদকেই ভোট দেবেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সাঈদকে ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, তাঁর এই টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টা আগেই স্টিভেন্সের প্রার্থী আবদুস সাঈদ জানিয়েছিলেন, তিনি রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে ভোট দেবেন।

এরপর শুক্রবার ডেট্রয়েটে আবদুস সাঈদ ও দক্ষিণ ক্যারোলিনার কংগ্রেস সদস্য জিম ক্লাইবার্নের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে সম্মত হওয়ার পর স্টিভেন্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেন।

সেখানে তিনি তাঁর সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বীর সমালোচনা করেন। স্টিভেন্স আবদুস সাঈদকে এমন একটি বিজ্ঞাপনের নিন্দা জানানোর আহ্বান করেন, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছিল।

এ ছাড়া তাঁর অতীতের কিছু বক্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানান স্টিভেন্স।

অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক আইনি চাপ

ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজারেরও বেশি ভোটারের ডাকযোগে দেওয়া ভোট বাতিলের প্রচেষ্টার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসির বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

এসব মামলার মাধ্যমে প্রশাসন ভোটারদের পূর্ণাঙ্গ ও কোনো তথ্য বাদ না দেওয়া তালিকা সংগ্রহ করতে চাইছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এসব আইনি পদক্ষেপ অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রধান কর্তৃত্ব রয়েছে।

শুক্রবার একজন ফেডারেল বিচারক বিচার বিভাগকে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার হুমকি দেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউসম অঙ্গরাজ্যের জ্যেষ্ঠ ফেডারেল বিচারকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সতর্ক করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের আগেই ভোটের ব্যালট জব্দ করার জন্য বিচার বিভাগ আদালতের কাছে অনুমতি চাইতে পারে।

তিনি বিচারকদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বলেন, ভোটের ব্যালট জব্দ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা।

অন্যদিকে, রয়টার্স/ইপসোসের একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৬ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন যে তাঁদের ভোট সঠিকভাবে গণনা করা হবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের ভোটারদের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রায় সমান মাত্রার আস্থা রয়েছে।

৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন

আগামী ৩ নভেম্বর, অর্থাৎ ১২ আবান যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এই নির্বাচনে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি আসন রয়েছে।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা নতুন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে আলাস্কা ও ক্যালিফোর্নিয়ার আইনি বিরোধ, মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং ভোট গণনা নিয়ে বিতর্ক মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha